বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে প্রাইভেট মার্কেটের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। শেয়ার কিংবা বন্ডের মতো পাবলিক মার্কেটের বাইরে এ বাজারের অধীনে যৌথ মূলধনি উদ্যোগ, প্রাইভেট ইকুইটি (বেসরকারি কোম্পানির মালিকানা), বেসরকারি ঋণ, অবকাঠামো, পণ্য ও রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ বর্তমানে আর্থিক কার্যক্রমে আধিপত্য বিস্তার করছে। তবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, এমনকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ব্যাংক খাতের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, তথ্যগত অস্বচ্ছতা ও তারল্যের অভাবে এটি আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
মার্কিন আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রাইভেট মার্কেটে পরিসম্পদের পরিমাণ ১৩ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৮ সালের পর প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে বেড়েছে এ পরিসম্পদের পরিমাণ।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রাইভেট মার্কেট অনেক বছর ধরেই পাবলিক মার্কেটের তুলনায় ইকুইটির মাধ্যমে অধিক পুঁজি সংগ্রহ করছে। একই সময়ে কোম্পানিগুলোর নিজের শেয়ার নিজে কিনে নেয়া (শেয়ার বাইব্যাক) ও অধিগ্রহণের কারণে পাবলিক মার্কেটের আকার সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু নতুন শেয়ার ইস্যুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় এ ঘাটতি পূরণ হয়নি। প্রাইভেট মার্কেট থেকে পুঁজির অব্যাহত সরবরাহে এ নিয়ে বাড়তি উদ্বেগে থাকতে হচ্ছে না কোম্পানিগুলোকে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে ‘বেসরকারি’ হিসেবে থেকে যাচ্ছে তারা।
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে প্রাইভেট মার্কেট বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট তৈরির সম্ভাবনা দেখছেন। তাদের মতে, প্রাইভেট মার্কেটের কারণে ইকুইটি মার্কেট ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ বিনিয়োগকারী, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ জনগণের চোখের আড়ালে থাকছে। কেননা প্রাইভেট মার্কেটে তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা চুক্তিভিত্তিক। কোনো নিয়ন্ত্রণ বিধির আওতায় বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই।
প্রাইভেট মার্কেটের কলেবর বৃদ্ধি মূলত ২০০৭-০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময় শুরু হয়। সে সময় নিম্ন সুদহারের সুবিধা নিয়ে কোম্পানিগুলোয় ব্যাপক বিনিয়োগ করতে শুরু করেন বিনিয়োগকারীরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাইভেট মার্কেটে বিনিয়োগকারীরা উল্লেখযোগ্য হারে মুনাফা পাবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়। অ্যামুন্ডি অ্যান্ড ক্রিয়েট রিসার্চের এক প্রতিবেদনে প্রাইভেট মার্কেটে বিনিয়োগের উচ্চ ফি ও চার্জের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা, যেমন কীভাবে কোম্পানির নির্বাহী সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বা বিনিয়োগ আদৌ ভালো পারফর্ম করছে কিনা তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যায়। এছাড়া প্রায়ই বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলে তার সবই শেষ পর্যন্ত বাজারে আসে না। এতে কোম্পানি পুঁজি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও মুনাফা হারাতে পারে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সম্পদে বেশি বিনিয়োগ মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে।
প্রাইভেট মার্কেটের বিকাশ নিয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রশ্ন রয়েছে। ইউএস সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক কমিশনার অ্যালিসন হেরেন লি বলেন, ‘প্রাইভেট মার্কেট কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য পাবলিক মার্কেটের স্বচ্ছতা ও মূল্য নির্ধারণের তথ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। পাবলিক মার্কেট সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের তথ্য পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে। এতে বিনিয়োগকারীরা যথাযথভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করতে পারেন। ফলে ভুল জায়গায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’
বেসরকারি ইকুইটি কিছু অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত নয়। ব্রিটিশ পানীয় শিল্পের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপকরা ভালো মালিক নন। কারণ তারা স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবন বা রক্ষণাবেক্ষণ করতে চান না।
প্রচলিত আর্থিক বাজারের নিয়ন্ত্রণ বিধির কড়াকড়িও প্রাইভেট মার্কেট বিকাশের অন্যতম কারণ। বিনিয়োগকারীরা বিকল্প বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে এ বাজারকে বেছে নিয়েছেন। এটি ছোট ও মাঝারি কোম্পানির জন্য নতুন ঋণের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ প্রক্রিয়ার ঝুঁকি নজরদারি করা কঠিন।
ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির দুই অধ্যাপক পালাদিনো ও কারলেউইজ বলেন, বেসরকারি ক্রেডিট তহবিল ব্যাংক খাতের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক, ঋণের অস্বচ্ছ শর্ত ও তারল্যের অভাবের কারণে আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
আইএমএফ বলেছে, বেসরকারি ক্রেডিটের দ্রুত বৃদ্ধি ও ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা মানহীন ঋণ নীতির ঝুঁকি বাড়ায়। ভবিষ্যতে এটি আর্থিক সংকটের কারণ হতে পারে।